পবিত্র বৃহস্পতিবার বা মাউন্ডি থার্সডে: বাংলাদেশে খ্রিস্টধর্মীয় ঐতিহ্যের এক অনন্য দিন
পবিত্র বৃহস্পতিবার, যা বিশ্বজুড়ে 'মাউন্ডি থার্সডে' (Maundy Thursday) বা 'হলি থার্সডে' নামে পরিচিত, খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের জন্য বছরের অন্যতম পবিত্র এবং তাৎপর্যপূর্ণ দিন। এটি যিশু খ্রিস্টের জীবনের শেষ সপ্তাহের বা 'পবিত্র সপ্তাহের' (Holy Week) পঞ্চম দিন। এই দিনটি মূলত যিশু খ্রিস্ট কর্তৃক তাঁর শিষ্যদের সাথে করা শেষ নৈশভোজ বা 'লাস্ট সাপার'-এর স্মৃতিকে স্মরণ করিয়ে দেয়। বাংলাদেশে খ্রিস্টান সম্প্রদায় অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্য এবং আধ্যাত্মিকতার সাথে এই দিনটি পালন করে। এটি কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা উদযাপন নয়, বরং বিনয়, সেবা এবং ভালোবাসার এক গভীর শিক্ষা বহন করে।
মাউন্ডি থার্সডের বিশেষত্ব হলো এর আধ্যাত্মিক গভীরতা। বাইবেল অনুসারে, এই দিনে যিশু তাঁর শিষ্যদের পা ধুইয়ে দিয়েছিলেন, যা ছিল চরম বিনয় এবং সেবার প্রতীক। তিনি শিখিয়েছিলেন যে, নেতা হওয়ার অর্থ হলো অন্যদের সেবা করা। এরপর তিনি রুটি ও আঙ্গুর রস (দ্রাক্ষারস) উৎসর্গ করেন, যা খ্রিস্টান ধর্মে 'পবিত্র মেলামেশা' বা 'ইউক্যারিস্ট' (Eucharist) প্রথার সূচনা করে। বাংলাদেশে বসবাসরত ক্যাথলিক এবং প্রোটেস্ট্যান্ট উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে এই দিনটি প্রার্থনার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি এবং যিশুর ত্যাগের পথে হাঁটার শপথ গ্রহণের দিন।
2026 সালে বাংলাদেশে পবিত্র বৃহস্পতিবার কবে?
বাংলাদেশে 2026 সালের পবিত্র বৃহস্পতিবার বা মাউন্ডি থার্সডে পালিত হবে আগামী April 2, 2026 তারিখে।
তারিখ: April 2, 2026
বার: Thursday
অবশিষ্ট সময়: এই পবিত্র দিনটি আসতে আর মাত্র 89 দিন বাকি।
পবিত্র বৃহস্পতিবারের তারিখটি প্রতি বছর পরিবর্তিত হয় কারণ এটি ইস্টারের তারিখের ওপর নির্ভর করে। খ্রিস্টীয় পঞ্জিকা অনুসারে, ইস্টার সানডের ঠিক তিন দিন আগে এই দিনটি পালন করা হয়। এটি একটি পরিবর্তনশীল তারিখের উৎসব যা সাধারণত মার্চ মাসের শেষ থেকে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে পড়ে থাকে। 2026 সালে এটি এপ্রিলের শুরুর দিকে পড়ায় বসন্তের আবহাওয়ায় এই ধর্মীয় উৎসবটি পালিত হবে।
মাউন্ডি থার্সডের ইতিহাস ও উৎপত্তির প্রেক্ষাপট
'মাউন্ডি' (Maundy) শব্দটি লাতিন শব্দ 'Mandatum' থেকে এসেছে, যার অর্থ হলো 'আদেশ' বা 'আজ্ঞা'। যিশু খ্রিস্ট তাঁর শেষ নৈশভোজের সময় শিষ্যদের একটি নতুন আজ্ঞা দিয়েছিলেন: "আমি তোমাদের একটি নতুন আজ্ঞা দিচ্ছি; তোমরা পরস্পরকে প্রেম করো; আমি যেমন তোমাদের প্রেম করেছি, তোমরাও তেমনি পরস্পরকে প্রেম করো।" এই আজ্ঞা বা ম্যান্ডেট থেকেই দিনটির নাম হয়েছে মাউন্ডি থার্সডে।
ঐতিহাসিকভাবে, যিশু খ্রিস্ট যখন জানতেন যে তাঁর ক্রুশারোপণের সময় আসন্ন, তখন তিনি তাঁর বারোজন শিষ্যের সাথে নিভৃতে সময় কাটানোর সিদ্ধান্ত নেন। জেরুজালেমের একটি 'উপরের ঘরে' (Upper Room) তারা নিস্তারপর্বের ভোজের জন্য একত্রিত হন। ভোজ শুরু হওয়ার আগে যিশু গামছা বেঁধে জল নিয়ে তাঁর শিষ্যদের পা ধুইয়ে দিতে শুরু করেন। সেই যুগে পা ধুইয়ে দেওয়া ছিল একজন দাসের কাজ। যিশু এই কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে, ঈশ্বর মানুষের সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দিতে পারেন।
এই ভোজ চলাকালীন যিশু রুটি ভেঙে বলেন, "এটি আমার দেহ" এবং আঙ্গুর রসের পেয়ালা তুলে বলেন, "এটি আমার রক্ত, যা অনেকের পাপ মোচনের জন্য ঢালা হচ্ছে।" এই ঘটনার মাধ্যমেই খ্রিস্টান জগতের প্রধান ধর্মীয় আচার 'পবিত্র প্রভুর ভোজ' বা 'কমিউনিয়ন' প্রবর্তিত হয়। বাংলাদেশের গির্জাগুলোতে এই ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে স্মরণ করা হয়।
বাংলাদেশে পবিত্র বৃহস্পতিবারের উদযাপন ও ঐতিহ্য
বাংলাদেশে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সংখ্যা সংখ্যালঘু হলেও তাদের ধর্মীয় উৎসবগুলো অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এবং ঐতিহ্যবাহী। ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশাল এবং উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোতে (যেমন দিনাজপুর ও রাজশাহী) মাউন্ডি থার্সডে উপলক্ষে বিশেষ আয়োজন করা হয়।
১. গির্জায় বিশেষ প্রার্থনা সভা (Mass or Service)
মাউন্ডি থার্সডের মূল অনুষ্ঠানটি শুরু হয় বিকেল বা সন্ধ্যায়। বাংলাদেশের ক্যাথলিক গির্জাগুলোতে এই সন্ধ্যায় একটি বিশেষ 'মাস' (Mass) অনুষ্ঠিত হয়। গির্জাগুলোকে সাদা বা বিশেষ রঙের কাপড়ে সাজানো হয়। প্রার্থনায় যিশুর শেষ নৈশভোজের কাহিনী পাঠ করা হয় এবং সমবেত সংগীত বা স্তোত্রগান গাওয়া হয়।
২. পা ধৌতকরণ অনুষ্ঠান (Washing of the Feet)
এটি এই দিনের সবচেয়ে আবেগঘন অংশ। গির্জার প্রধান পুরোহিত বা ফাদার যিশুর পদাঙ্ক অনুসরণ করে ১২ জন সাধারণ মানুষের (সাধারণত গির্জার সদস্য বা প্রবীণ ব্যক্তি) পা ধুইয়ে দেন। বাংলাদেশে অনেক স্থানে এই ১২ জন ব্যক্তিকে যিশুর ১২ জন শিষ্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই দৃশ্যটি উপস্থিত ভক্তদের মধ্যে বিনয় এবং ভ্রাতৃত্ববোধের জন্ম দেয়।
৩. পবিত্র মেলামেশা বা কমিউনিয়ন
প্রার্থনা সভার শেষে পবিত্র রুটি ও আঙ্গুর রস বিতরণ করা হয়। এটি যিশুর ত্যাগের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। বাংলাদেশের গ্রামীন গির্জাগুলোতে এই সময় এক শান্ত ও গাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করে। সবাই পরম শ্রদ্ধায় এই আচারে অংশ নেন।
৪. অল্টার সজ্জা উন্মোচন ও উপাসনা
প্রার্থনা শেষে গির্জার অল্টার বা বেদী থেকে সমস্ত অলঙ্কার, মোমবাতি এবং কাপড় সরিয়ে ফেলা হয়। এটি যিশুর একাকীত্ব এবং তাঁর বন্দি হওয়ার প্রতীক। এরপর ভক্তরা যিশুর সাথে জেগে থাকার জন্য গির্জায় বা বিশেষ স্থানে রাত জেগে প্রার্থনা করেন। অনেকে এই রাতটিকে 'পবিত্র প্রহর' হিসেবে পালন করেন।
বাংলাদেশের খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের খাদ্যাভ্যাস ও সামাজিক রীতি
বাংলাদেশে ধর্মীয় উৎসব মানেই বিশেষ খাবার। তবে মাউন্ডি থার্সডে যেহেতু একটি শোকাবহ ও গাম্ভীর্যপূর্ণ সময়ের (লেন্ট বা উপবাসের কাল) অংশ, তাই এই দিনে খুব বেশি জাঁকজমকপূর্ণ খাবার তৈরি করা হয় না।
নিরামিষ বা হালকা আহার: অনেক পরিবার এই দিনে নিরামিষ খাবার গ্রহণ করে। মাংস এড়িয়ে চলা হয়।
পারিবারিক পুনর্মিলন: সন্ধ্যার প্রার্থনার পর পরিবারের সদস্যরা একসাথে বসে রাতের খাবার খান। এটি অনেকটা যিশুর সেই শেষ নৈশভোজের পারিবারিক সংস্করণের মতো।
দান-ধ্যান: মাউন্ডি থার্সডে উপলক্ষে বাংলাদেশের অনেক খ্রিস্টান পরিবার গরিব-দুঃখীদের মধ্যে খাদ্য বা অর্থ সাহায্য প্রদান করে। যিশুর সেবার আদর্শকে বাস্তব জীবনে রূপ দিতেই এই প্রচেষ্টা।
পর্যটক এবং প্রবাসীদের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য
যদি আপনি 2026 সালের April 2, 2026 তারিখে বাংলাদেশে থাকেন এবং এই উৎসবটি প্রত্যক্ষ করতে চান, তবে কিছু বিষয় মাথায় রাখা জরুরি:
১. গির্জা পরিদর্শন: ঢাকার রমনা ক্যাথেড্রাল, হলি রোজারি চার্চ (তেজগাঁও) বা সেন্ট মেরিস ক্যাথেড্রালে বড় পরিসরে অনুষ্ঠান হয়। তবে মনে রাখবেন, এটি একটি পবিত্র ধর্মীয় আচার, তাই গির্জার ভেতরে থাকাকালীন নীরবতা বজায় রাখা এবং ছবি তোলার ক্ষেত্রে অনুমতি নেওয়া প্রয়োজন।
২. পোশাক-আশাক: গির্জায় যাওয়ার সময় মার্জিত এবং শালীন পোশাক পরা বাঞ্ছনীয়। স্থানীয়রা সাধারণত সাদা বা হালকা রঙের পোশাক পরে থাকেন।
৩. পরিবহন ও চলাচল: মাউন্ডি থার্সডে বাংলাদেশে কোনো সাধারণ ছুটির দিন নয়, তাই রাস্তাঘাটে যানজট বা গণপরিবহন স্বাভাবিক থাকবে। গির্জাগুলোর আশেপাশে সন্ধ্যার দিকে কিছুটা ভিড় হতে পারে।
৪. ব্যবসায়িক কার্যক্রম: এই দিনে বাংলাদেশের ব্যাংক, অফিস এবং দোকানপাট সব খোলা থাকে। শুধুমাত্র খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী কর্মীরা ঐচ্ছিক ছুটি ভোগ করতে পারেন।
বাংলাদেশে ছুটির মর্যাদা: এটি কি সাধারণ ছুটি?
বাংলাদেশে মাউন্ডি থার্সডে বা পবিত্র বৃহস্পতিবার সাধারণ সরকারি ছুটি নয়। এটি একটি ঐচ্ছিক ছুটি (Optional Holiday) হিসেবে বিবেচিত হয়।
খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের জন্য: সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীরা এই দিনে অগ্রিম অনুমতির মাধ্যমে ছুটি নিতে পারেন।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: মিশনারি স্কুল এবং কলেজগুলো সাধারণত এই দিনে বন্ধ থাকে বা হাফ-স্কুল পালন করে।
- সাধারণ জনজীবন: দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম এবং অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের জন্য এটি একটি স্বাভাবিক কর্মদিবস। ব্যাংক, বীমা, কলকারখানা এবং সরকারি অফিসগুলো যথারীতি খোলা থাকে।
তবে মাউন্ডি থার্সডের পরের দিন, অর্থাৎ 'গুড ফ্রাইডে' (Good Friday), বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রে বিশেষ মর্যাদায় দেখা হয় এবং খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের জন্য তা আরও বড় ধর্মীয় গুরুত্ব বহন করে। যদিও গুড ফ্রাইডেও জাতীয় ছুটি নয়, তবে শুক্রবার এমনিতেই বাংলাদেশে সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় খ্রিস্টানরা পূর্ণ দিবস প্রার্থনায় কাটাতে পারেন।
উপসংহার
মাউন্ডি থার্সডে বা পবিত্র বৃহস্পতিবার বাংলাদেশের খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের জন্য কেবল ক্যালেন্ডারের একটি দিন নয়, বরং এটি তাদের বিশ্বাসের মূল ভিত্তি। যিশু খ্রিস্টের ভালোবাসা, ক্ষমা এবং সেবার আদর্শ এই দিনটির মাধ্যমে নতুন করে প্রাণ পায়। বাংলাদেশে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের সহাবস্থানের মধ্যে এই ধরনের ধর্মীয় আচারগুলো দেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে আরও সমৃদ্ধ করে।
2026 সালের April 2, 2026 তারিখে যখন বাংলাদেশের গির্জাগুলোতে মোমবাতি জ্বলবে এবং সমবেত প্রার্থনা ধ্বনিত হবে, তখন তা কেবল একটি সম্প্রদায়ের উৎসব হিসেবে নয়, বরং মানবতা ও ত্যাগের এক চিরন্তন বার্তা হিসেবে প্রতিধ্বনিত হবে। আপনি যদি এই সময়ে বাংলাদেশে থাকেন, তবে এই শান্ত ও আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার অংশ হওয়া আপনার জন্য এক অনন্য স্মৃতি হয়ে থাকবে।