বাংলাদেশে পবিত্র রমজান মাসের সূচনা: একটি পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা
রমজানুল মোবারক হলো ইসলাম ধর্মের পবিত্রতম মাস। বাংলাদেশের ১৬ কোটিরও বেশি মানুষের বিশাল একটি অংশ মুসলিম হওয়ায়, এই মাসটি এদেশের সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। রমজান শুধু উপবাসের মাস নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, সংযম, সহমর্মিতা এবং মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক বিশেষ সুযোগ। বাংলাদেশে রমজান মাসের সূচনা হয় এক উৎসবমুখর এবং আধ্যাত্মিক পরিবেশের মধ্য দিয়ে। নতুন চাঁদ দেখার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই মাসটি পুরো দেশের জীবনযাত্রায় এক আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসে।
রমজানের মূল চেতনা হলো 'তাকওয়া' বা আল্লাহর ভয় অর্জন করা। ভোররাত থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার এবং সকল প্রকার পাপাচার থেকে বিরত থেকে একজন মুমিন তার নফস বা প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে। বাংলাদেশে এই মাসটি অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্যের সাথে পালিত হয়। ধনি-দরিদ্র নির্বিশেষে সবাই একই কাতারে দাঁড়িয়ে ইবাদত বন্দেগি করে। পাড়া-মহল্লার মসজিদগুলো মুসল্লিদের উপস্থিতিতে মুখরিত হয়ে ওঠে এবং প্রতিটি ঘরে ঘরে এক পবিত্র আবহ তৈরি হয়।
এই নিবন্ধে আমরা ২০২৬ সালের রমজান মাসের সম্ভাব্য তারিখ, বাংলাদেশের মানুষের রমজান পালনের পদ্ধতি, ঐতিহ্যবাহী খাবার এবং এই সময়ের বিশেষ নিয়মকানুন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
2026 সালে বাংলাদেশে রমজান কবে শুরু হবে?
বাংলাদেশে রমজান মাসের শুরু মূলত চাঁদ দেখার ওপর নির্ভরশীল। হিজরি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী নবম মাস হলো রমজান। বাংলাদেশের জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি প্রতি বছর ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বায়তুল মোকাররম সভাকক্ষে চাঁদ দেখার সংবাদ পর্যালোচনা করে রমজান শুরুর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়।
গাণিতিক হিসাব এবং বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০২৬ সালের রমজান মাসের সম্ভাব্য সময়সূচী নিচে দেওয়া হলো:
রমজান শুরুর সম্ভাব্য তারিখ: February 18, 2026
রমজান শুরুর দিন: Wednesday
বাকি আছে: আর মাত্র 46 দিন
ইসলামি ক্যালেন্ডার বা হিজরি ক্যালেন্ডার যেহেতু চন্দ্রভিত্তিক, তাই প্রতি বছর রমজান মাস ১০ থেকে ১২ দিন এগিয়ে আসে। বাংলাদেশে সাধারণত সৌদি আরবের একদিন পর রমজান শুরু হয়, তবে এটি পুরোপুরি চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করে। যদি ১৭ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় চাঁদ দেখা যায়, তবে ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে রোজা শুরু হবে। অন্যথায়, ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে রোজা শুরু হতে পারে।
রমজানের তাৎপর্য ও ধর্মীয় গুরুত্ব
রমজান মাস মুসলিম উম্মাহর জন্য রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস। বাংলাদেশের মানুষের কাছে এই মাসের গুরুত্ব অপরিসীম।
১. কুরআন নাজিলের মাস: এই পবিত্র মাসেই মানবজাতির হেদায়েতের জন্য পবিত্র কুরআনুল কারিম নাজিল হয়েছিল। এজন্য এই মাসে কুরআন তিলাওয়াতের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়।
২. লাইলাতুল কদর: রমজানের শেষ দশ দিনের বিজোড় রাতগুলোর মধ্যে লুকিয়ে আছে 'লাইলাতুল কদর' বা হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ রাত। বাংলাদেশের মানুষ অত্যন্ত ভক্তিভরে এই রাতটি তালাশ করে।
৩. ইবাদত ও সওয়াব: বিশ্বাস করা হয় যে, রমজান মাসে একটি নফল ইবাদতের সওয়াব অন্য মাসের ফরজের সমান এবং একটি ফরজের সওয়াব সত্তর গুণ বৃদ্ধি পায়।
৪. সহমর্মিতা: সারাদিন ক্ষুধার্ত থাকার মাধ্যমে একজন রোজাদার গরিব ও দুস্থ মানুষের ক্ষুধার কষ্ট অনুভব করতে পারে। ফলে সমাজে দান-সদকা ও জাকাত প্রদানের হার বেড়ে যায়।
বাংলাদেশে রমজানের প্রস্তুতি ও দৈনন্দিন রুটিন
রমজান আসার অন্তত এক মাস আগে থেকেই বাংলাদেশে প্রস্তুতির ধুম পড়ে যায়। বাজারঘাট থেকে শুরু করে ঘরবাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা—সবকিছুতেই থাকে রমজানের ছোঁয়া।
সেহরি: দিনের শুরু
রমজানের রোজা শুরু হয় 'সেহরি' খাওয়ার মাধ্যমে। সুবহে সাদিকের আগে এই খাবার খাওয়া সুন্নত। বাংলাদেশে সেহরির সময়টি বেশ উৎসবমুখর থাকে। পাড়া-মহল্লায় 'সেহরি ডাকার' ঐতিহ্য এখনও বিদ্যমান, যেখানে একদল মানুষ বা মসজিদের মাইক থেকে রোজাদারদের ঘুম থেকে জাগিয়ে দেওয়া হয়। সেহরিতে সাধারণত ভাত, ডাল, মাছ বা মাংসের মতো ভারী খাবার খাওয়া হয় যাতে সারাদিন শক্তি বজায় থাকে।
সিয়াম পালন বা রোজা
ফজর থেকে মাগরিব পর্যন্ত একজন মুসলিম সব ধরণের খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ থেকে বিরত থাকেন। শুধু তাই নয়, মিথ্যা বলা, গীবত করা বা ঝগড়া বিবাদ থেকেও নিজেকে দূরে রাখতে হয়। বাংলাদেশের অফিস-আদালত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সময়সূচী এই সময়ে কমিয়ে আনা হয় যাতে মানুষ ইবাদতে বেশি সময় দিতে পারে।
ইফতার: আনন্দের মুহূর্ত
সূর্যাস্তের সাথে সাথে ইফতার করা হয়। বাংলাদেশে ইফতার আয়োজন এক বিশাল ব্যাপার। পরিবার-পরিজন নিয়ে একসাথে ইফতার করা এদেশের সংস্কৃতি। রাস্তার ধারের দোকানগুলোতে হরেক রকমের ইফতারি সাজিয়ে রাখা হয়। ঢাকার 'চকবাজারের ইফতারি' বিশ্বজুড়ে পরিচিত।
বাংলাদেশি ইফতারের ঐতিহ্যবাহী খাবার
বাংলাদেশের ইফতারি মানেই বৈচিত্র্যের মেলা। যদিও প্রতিটি অঞ্চলেই কিছু নিজস্ব খাবার থাকে, তবে সাধারণ কিছু খাবার সবখানেই দেখা যায়:
খেঁজুর: সুন্নতি নিয়ম অনুযায়ী খেঁজুর দিয়ে ইফতার শুরু করা হয়।
ছোলা-মুড়ি: এটি বাংলাদেশের ইফতারের প্রধান অংশ। পেঁয়াজ, মরিচ ও আদা দিয়ে ভুনা করা ছোলা এবং মুড়ি মাখানো প্রায় প্রতিটি ঘরেই থাকে।
পিঁয়াজু ও বেগুনি: খেসারির ডালের বাটা ও বেসনের প্রলেপে ভাজা এই মচমচে খাবারগুলো ছাড়া ইফতার অসম্পূর্ণ।
হালিম: গরু বা খাসির মাংস দিয়ে তৈরি ঘন ডাল বা হালিম বাংলাদেশের একটি জনপ্রিয় রমজানি খাবার।
শরবত: লেবুর শরবত, রুহ আফজা বা তোকমার শরবত ক্লান্তি দূর করতে সাহায্য করে।
জিলিপি: ইফতারের শেষে মিষ্টি হিসেবে গরম গরম জিলিপি খাওয়ার রেওয়াজ খুব পুরনো।
ফলমূল: তরমুজ, কলা, পেঁপে এবং আপেলের মতো মৌসুমি ফল ইফতারের টেবিলে সতেজতা আনে।
তারাবিহ নামাজ ও আধ্যাত্মিকতা
রমজানের রাতের বিশেষ ইবাদত হলো 'তারাবিহ নামাজ'। এশার নামাজের পর ২০ রাকাত তারাবিহ নামাজ আদায় করা হয়। বাংলাদেশের প্রতিটি মসজিদে খতম তারাবিহ (যেখানে পুরো মাসে একবার কুরআন খতম করা হয়) এবং সূরা তারাবিহ (যেখানে ছোট সূরা দিয়ে নামাজ পড়া হয়) আয়োজন করা হয়। ঢাকার বায়তুল মোকাররমসহ বড় বড় মসজিদগুলোতে হাজার হাজার মানুষ একসাথে নামাজ আদায় করেন। এই নামাজ মুসলিমদের মধ্যে ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ় করে।
রমজানের শেষ ১০ দিন ও ইতিকাফ
রমজানের শেষ ১০ দিন বাংলাদেশের মুসলিমদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই এই সময়ে মসজিদে 'ইতিকাফ' করেন। অর্থাৎ ঘরবাড়ি ছেড়ে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মসজিদে অবস্থান করে শুধুমাত্র আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন থাকেন। এই দশ দিনের মধ্যেই লাইলাতুল কদরের সন্ধানে মানুষ রাত জেগে নফল নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত ও জিকির আজকার করে।
দান-সদকা ও জাকাত
রমজান মাসে বাংলাদেশে অভাবী মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক অনন্য প্রতিযোগিতা শুরু হয়। ধনাঢ্য ব্যক্তিরা তাদের সম্পদের 'জাকাত' এই মাসে প্রদান করেন। বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্থা ইফতার মাহফিলের আয়োজন করে যেখানে গরিব ও ছিন্নমূল মানুষরা পেট ভরে খাবার সুযোগ পায়। ফিতরা প্রদানের মাধ্যমে রমজানের শেষের দিকে অভাবী মানুষের ঈদের আনন্দ নিশ্চিত করা হয়।
পর্যটক এবং প্রবাসীদের জন্য প্রয়োজনীয় পরামর্শ
আপনি যদি রমজান মাসে বাংলাদেশে অবস্থান করেন, তবে কিছু বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি:
১. প্রকাশ্যে পানাহার পরিহার করুন: বাংলাদেশে রমজানের প্রতি মানুষের গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে। যদিও অমুসলিম বা অসুস্থদের জন্য রোজা রাখা বাধ্যতামূলক নয়, তবুও দিনের বেলা জনসম্মুখে খাবার বা পানীয় গ্রহণ না করাই সৌজন্যবোধের পরিচয়।
২. অফিস ও ব্যাংকিং সময়: রমজান মাসে বাংলাদেশের সরকারি ও বেসরকারি অফিসের সময় পরিবর্তন করা হয়। সাধারণত সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা বা সাড়ে ৩টা পর্যন্ত অফিস চলে। ব্যাংকগুলোও তাদের লেনদেনের সময় কমিয়ে দেয়।
৩. যানজট সচেতনতা: ইফতারের ১-২ ঘণ্টা আগে বড় শহরগুলোতে বিশেষ করে ঢাকায় তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। সবাই ইফতারের আগে বাসায় পৌঁছানোর চেষ্টা করে, তাই এই সময়ে ভ্রমণ এড়িয়ে চলাই ভালো।
৪. পোশাক-আশাক: এই মাসে সবাই একটু বেশি ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে চলে। তাই শালীন পোশাক পরিধান করা বাঞ্ছনীয়।
৫. রেস্তোরাঁ: দিনের বেলা বেশিরভাগ রেস্তোরাঁ বন্ধ থাকে অথবা পর্দার আড়ালে খাবার পরিবেশন করে। তবে ইফতারের সময় সব রেস্তোরাঁই বিশেষ মেনু নিয়ে হাজির হয়।
৬. সেহরি ও ইফতারের সময়সূচী: প্রতিদিনের সেহরি ও ইফতারের সময় কয়েক মিনিট করে পরিবর্তিত হয়। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম বা মসজিদের আজান অনুসরণ করা সবচেয়ে ভালো।
রমজান কি বাংলাদেশে সরকারি ছুটির দিন?
রমজান মাস শুরু হওয়ার দিনটি বাংলাদেশে সাধারণত সাধারণ ছুটি হিসেবে পালিত হয় না। তবে এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ইভেন্ট। রমজানের শুরু থেকে অফিস-আদালত এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সময়সূচী পরিবর্তন করা হয়।
পুরো মাস জুড়ে দোকানপাট এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কার্যক্রম কিছুটা কমিয়ে আনে, বিশেষ করে দুপুরের দিকে। তবে রমজানের শেষে 'ঈদুল ফিতর' উপলক্ষে বাংলাদেশে তিন থেকে পাঁচ দিনের সরকারি ছুটি পালিত হয়। এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় উৎসব, যখন শহর থেকে লাখ লাখ মানুষ নাড়ির টানে গ্রামে ফিরে যায়।
উপসংহার
বাংলাদেশের মানুষের কাছে রমজান মানেই এক অন্যরকম আবেগ। এটি শুধু ক্ষুধার মাস নয়, এটি ধৈর্যের মাস। এই মাসে বাংলাদেশের মানুষ তাদের আধ্যাত্মিক শক্তি সঞ্চয় করে এবং সামাজিক ভ্রাতৃত্ব বজায় রাখে। ২০২৬ সালের রমজান আমাদের জীবনে শান্তি ও সমৃদ্ধি বয়ে আনুক। February 18, 2026 তারিখে যখন নতুন চাঁদ আকাশে দেখা দেবে, তখন পুরো বাংলাদেশ এক সুরে বলে উঠবে— 'রমজান মুবারক'।
নির্ধারিত সময় 46 দিন পর শুরু হতে যাওয়া এই পবিত্র মাসটির জন্য এখন থেকেই শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন। সংযম ও ত্যাগের এই শিক্ষা যেন আমাদের সারা বছর সৎ পথে চলতে সাহায্য করে।